শহীদের শহরে/সুব্রত ভট্টাচার্য
শহীদের শহরে
সুব্রত ভট্টাচার্য
ভাষা শহীদের শহর শিলচর। দক্ষিণ অসমের শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি জেলাকে নিয়ে বলা হয় বরাক উপত্যকা। এখানে বাংলাভাষী মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। সঙ্গে রয়েছে অসমীয়া, মনিপুরী, নেপালি, মিজো এবং আরও অন্যান্য ভাষাভাষীর মানুষজন।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চার জন্য শিলচর শহরের সুনাম রয়েছে। বরাক উপত্যকা থেকে প্রকাশ হয় বেশ কিছু ভালো বাংলা পত্র পত্রিকা। বিখ্যাত নদী বরাক থেকে এ অঞ্চলের নাম বরাক উপত্যকা। মনিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা যাবার সময় শিলচর ছুঁয়ে যেতে হয়। এ তিনটি রাজ্যের ব্যবহারের সামগ্রী শিলচর শহর হয়ে পৌছায়। ব্যবসায়িক দিক থেকে এ শহরের গুরুত্ব অনেকখানি।
শিলচর শহর থেকে একখানা নিমন্ত্রন পাওয়া গেছে। অফিসের সহকর্মীর বাড়ীর একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে। দিনক্ষণ দেখে রিজার্ভেশন করে ফেললাম সপরিবারে। এক সময় শিলচর যাত্রা বেশ কষ্টকর ছিলো। গুয়াহাটি থেকে গাড়ী বদল করে মিটার গেজে শিলচর যাওয়া। মাঝে পাহাড় লাইনে রেলপথের দৃশ্য খুব সুন্দর। কোথাও দুটি পাহাড়কে যোগ করেছে সেতু আবার কোথাও পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চলে গেছে টানেল। পাহাড়ের গায়ে দেখা যায় গ্রামবাসীদের জুম ক্ষেত। নানান রকম গাছপালা আর মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো গ্রাম। বর্ষায় মাঝে মাঝেই ধ্বস নেমে পাহাড় লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হত। যাত্রীরা পড়তেন দুর্ভোগে। ব্রডগেজ হবার পর রেলযাত্রার বিঘ্ন অনেকটা কমেছে। এখন সোজাসুজি এবং কম সময়ে পৌঁছে যাওয়া যায় শিলচরে।
ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছাড়লো কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। আমাদের গন্তব্য শিলচর। কোচবিহার, নিউবঙ্গাইগাও, গুয়াহাটি, লামডিং, হাফলং, বদরপুর পার হয়ে শিলচর। ভোর তিনটেয় পৌছালো গুয়াহাটি। কামরায় বেশ শোরগোল, বড় স্টেশন অনেক যাত্রী নেমে গেলেন। আবার উঠলেন নতুন যাত্রী। সকালবেলা লামডিং ছাড়ার কিছুক্ষন পড়ে পাহাড় লাইনে যাত্রা শুরু হলো। পাহাড়ি পথ, টানেল পার হয়ে আড়াইটা নাগাদ পৌছালাম শিলচরে।
১৯৬১ এপ্রিল মে মাসে অসমের বরাক বরাক ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন চলছিলো। ১৯শে মে শিলচর শহরে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলি চলে। অকালে ঝরে যায় ১১টি তরতাজা প্রান। বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষা রক্ষার এ আন্দোলন সার্থক হয়। বরাক উপত্যকায় সরকারী ভাষা হিসেবে বাংলার ব্যবহার স্বীকৃতি পায়। এখনও প্রতি বছর বরাক উপত্যকায় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভাষা শহীদ দিবস পালন করা হয়। শিলচর রেল স্টেশনের সামনে তৈরি হয়েছে ভাষা শহীদদের সম্মানে স্মৃতিস্তম্ভ।
শিলচরে পৌছুতেই উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়া গেলো। হোটেলে পৌছে দেখা হল পুরোনো বন্ধুবান্ধবদের সাথে। সন্ধ্যায় বিয়েবাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠান। দুদিন বিয়েবাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠান কেটে গেল খুব মজা করে। বিয়েতে ধামাইল নৃত্যের পরিবেশন দেখা গেলো। সাদা পোষাকে সজ্জিত মনিপুরি বাজনার দল দেখে বেশ নতুনত্বের স্বাদ পাওয়া গেল।
তৃতীয় দিন দেখা হল কয়েকজন পরিচিত মানুষের সাথে। টোটো ভাড়া করে শহরের কিছু জায়গা, বাজার, বরাক নদী দেখে নিলাম। শহরে রয়েছে বেশ কিছু নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রয়েছে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এক বছর আগে ভয়ঙ্কর বন্যায় শিলচর শহরের বিভিন্ন অঞ্চল ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। সে চিহ্ন বিভিন্ন জায়গায় এখনও রয়ে গেছে। ভীষন রকম প্লাস্টিক দুষন চোখে পড়ল প্রায় শহর জুড়েই। প্রশাসন এবং নাগরিকরা সচেতন না হলে ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনবে।
অসমে কখনও কখনও ব্রহ্মপুত্র এবং বরাক উপত্যকার মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলেও আবার সেটা মিটেও যায়। রাজধানী দিসপুর হবার জন্য বরাক উপত্যকার মানুষকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার উপর নির্ভর করতে হয়। কখনও কখনও স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে বঞ্চনার অভিযোগ করেন বরাক উপত্যকার নেতারা।
অসমের প্রধান উৎসব বিহু। বরাক উপত্যকায় বিহুর সাথে সাথে জনপ্রিয় নৃত্য ধামাইল। বিয়ে বা অন্য সামাজিক অনুষ্ঠানে ধামাইল নৃত্য পরিবেশন করা হয়। বাদ্যযন্ত্রের সাথে মহিলারা দলবদ্ধ ভাবে গান এবং নৃত্য পরিবেশন করেন। এ অঞ্চলের মানুষের ভেতরে পান সুপারি খাবার প্রচলন খুব বেশী। অতিথি আপ্যায়নে পান সুপারি খুবই ব্যবহৃত হয়। এ জন্য স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কিছু সমস্যা এ অঞ্চলে বেশী।
ভাষা বাংলা হলেও শ্রীহট্ট অঞ্চলের কথ্যভাষা এখানে ব্যবহৃত হয়। শ্রীহট্ট অঞ্চলের মানুষের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ অনেক পুরনো। হিন্দু মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। স্বাধীনতার আগে এবং পরবর্তী সময়ে উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ অঞ্চলের অনেক মানুষ কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে কিছুটা কম। উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলাভাষী মানুষেরা অত্যন্ত অতিথিপরায়ন। পরিচয়ের সুযোগ হলেই ব্যপারটা বোঝা যায়।
চারদিন শিলচর শহরে থেকে আবার রওনা হই নিজের শহরের উদ্দেশ্যে। বাংলার মুল ভুখন্ড থেকে দূরে থেকেও বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যদিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বরাক উপত্যকার মানুষজন প্রশংসার দাবি রাখে।
আপনাদের
মূল্যবান মতামত জানাতে কমেন্ট করুন ↴