বাগানিয়া জার্নাল
পর্ব।। পাঁচ।।
শিশির রায়নাথ
^^^^^^^^^^^^^^^^
[চা
গাছের কাঁচা পাতা থেকে প্রথমে যা তৈরি করা হয় তাকে বলি ‘চা’।আবার সেই
‘চা’ জলে ফুটিয়ে যা আমরা খাই তাকেও বলি ‘চা’। এই দুই রকমের ‘চা’-এর
পার্থক্য বোঝানোর জন্য আমরা কাঁচা পাতা থেকে তৈরি প্রথম ‘চা’-কে বলব
‘তৈরি-চা’ (processed Tea)। আর জলে ফোটানো চা-কে বলব ‘পানীয়-চা’(Liquor
Tea)]
পৃথিবীতে যতরকমের ‘চা’ আছে সবই তৈরি করা হয় ওই একটি মাত্র গাছ ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস (Camellia sinensis)-এর পাতা থেকেই।
কাঁচা
পাতা থেকে processed Tea তৈরি করার পদ্ধতি অনুসারে ‘তৈরি চা’-কে মূলত
দুইভাগে ভাগ করা যায়- সবুজ-চা (Green Tea) আর কালো-চা (Black Tea)। আমরা যে
লাল চা (Red Tea),সাদা চা (White Tea), হলুদ চা (Yellow Tea),বেগুনী চা
(Purple Tea) বলি – তা সবই ওই কালো-চা তৈরির পদ্ধতিরই রকমফের মাত্র।
আগের পর্বে সবুজ-চা (Green Tea) তৈরির কথা বলা হয়েছে।এই সবুজ-চা থেকে কালো-চায়ে পৌঁছতে অনেক শতাব্দী পার হয়ে গ্যাছে।
পন্ডিতেরা
বলেন প্রায় তিন হাজার বছর আগেই চায়ের কাঁচা পাতা চিবিয়ে খাবার প্রচলন ছিল –
ওষধি হিসেবে। ২৩৩৭ খৃঃপূঃ-এ প্রথিতযশা চিন সম্রাট তথা ভেষজ-ওষধি বিশেষজ্ঞ
শ্যেন নং (Shennong)- এর উপকথা ধরে কাঁচা পাতা সরাসরি জলে সিদ্ধ করে খাবার
প্রথা আবিষ্কার হল। খৃষ্টীয় অষ্টম শতকে কাঁচা পাতাকে জলে সিদ্ধ করে তারপর
শুকিয়ে পৌঁছোন হল সবুজ-চায়ের প্রাথমিক পর্যায়ে।
কিন্তু
সেখানেই থেমে থাকল না সবকিছু। সবুজ-চায়ের গুণমান আরও উন্নত করা ও
দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতেই থাকল।
এই
সময়ে একটা বেশ মজার ঘটনা ঘটল। এমন ঘটনা - যা সব রকম চা-তৈরির ক্ষেত্রে আজও
অনুসরণ করা হয়। কিন্ত কীভাবে যে তা ঘটল তা আর আজ জানার কোন উপায় নেই।কেউ
কোথাও যে কিছু লিখে রাখে নি। তাই আমরা এবার একটু কল্পনার আশ্রয় নিতে পারি
এখানে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের
প্রয়োজনে চা-কে পাঠাতে হয় দূর-দূরান্তে। তাই তাকে কাঠের বাক্সে বা কাপড়ের
ব্যাগে ভরতে হয়। হাতের পাতার মত ছড়ানো চা-পাতা অনেকটা জায়গা খেয়ে নেয়।তাই
তাকে ঠেসে ঠেসে- যাতে একবারে বেশী পাতা ধরে – ভরা হয় বাক্সে,ব্যাগে।কখনও বা
কেক বা ইঁট বানিয়ে তারপর তা চালান করা হয়। বেশ কিছুদিন পর ভোক্তা সেই
বাক্স বা ব্যাগ খুলে চা-পাতা বার করে ব্যবহার করে। দেখা গেল এই ঠাসা-চা মূল
চায়ের থেকে গুণমানে অনেক ভালো।
তখন
চা-চাষীরা নিজেরাই সিদ্ধ চা-পাতাকে ঠেসে ঠেসে বা হাতের তালুতে ঘষে ঘষে,
দলাই-মলাই করে পরীক্ষা করে দেখল যে সত্যিই চায়ের গুণমান অনেক ভালো হচ্ছে,
উপরন্তু একটা আলাদা রকমের সুবাস (aroma)পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি সেই চা-পাতা ও
পানীয়-চায়ের (liquor Tea) রঙও সবুজ থেকে পালটে কালচে-লাল হয়ে যাচ্ছে।
আরও
দেখা গেল ঘষে রাখা চা-পাতাকে যদি ওভাবেই বেশ কিছুদিন ফেলে রাখা হয় – তা
হলে তা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তাকে যদি, দলাই-মলাইয়ের পর, আবার রোদে শুকিয়ে
রাখা হয় – তা হলে তা বেশ সুন্দর থাকে এবং তা থেকে সবুজ-চায়ের বদলে একরকমের
লাল-চা পাওয়া যায় – যার স্বাদ-গন্ধ একদমই অন্যরকম।আর সেই চা-ও সবুজ-চায়ের
মতই একই রকম ঘুম-তাড়ানি, উত্তেজক।অর্থাৎ সবুজ-চায়ের সব গুণ তো বজায় থাকছেই –
সঙ্গে নতুন নতুন আরও কিছু গুণ পাওয়া যাচ্ছে। উপরন্তু, এই চা-কে দীর্ঘদিন
জমিয়ে রাখা (preserved) যাচ্ছে।
আর, এভাবেই তৈরি হল
মানুষের দ্বিতীয় processed Tea – যার নাম লাল-চা (Red Tea)-যাকে চিনা ভাষায়
বলে ওলং বা উলং (Oolong/wulong)- মানে ‘কালো ড্রাগন’।
ওলং
চা কবে কোথায় কে প্রথম আবিষ্কার করেছিল – তা নিয়ে নানা গল্পকথা চালু
আছে।তার একটা এরকম যে, উ লিয়াং [Wu Liang – যা পরে লোকমুখে পালটে হয়েছে উ
লং (Wu Long) বা উলং( Oolong)] ঘটনাচক্রে আবিষ্কার করে ফেলেছে এই চা। সে
একদিন চা পাতা তোলার পর, পাতার ঝুড়ি ফেলে রেখে, একটা হরিণ ধরাব্র জন্য
সারাদিন ছুটেছিল। দিনের শেষে তার চায়ের ঝুড়ির কথা মনে পড়ে। ফিরে এসে দ্যাখে
ততক্ষণে চা পাতা সব লাল হতে শুরু করেছে (কেন – তা পরে বলা হয়েছে)। সেইপাতা
সিদ্ধ করে সে কালচে -লাল রঙের চা পায়। সেই থেকে ওলং চায়ের জন্ম।
সেই
সময়ের চিনা চা-চাষীরা এইভাবে কালচে-লাল চা তৈরি হবার কারণ তো জানতো না।
এসব ছিল তাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান (empirical knowledge)।কিন্তু এর পিছনে
সত্যি সত্যিই যা ঘটে তা খুবই জটিল বিজ্ঞানের ব্যাপার – যার সবটা এখনও জেনে
ওঠা সম্ভব হয় নি।
সেসব জটিল বৈজ্ঞানিক ব্যাপারে না গিয়ে এখানে আলগোছে যতটা পারা যায়- একটু বলার চেষ্টা করা যাক।
আগেই
বলা হয়েছে চা-য়ের যে সব গুণের জন্য আমরা চা খাই – সেই ঘুম-কেটে-যাওয়া,
শরীর চনমনে হওয়া ইত্যাদি – তা হয় চায়ের পাতায় থাকা প্রায় এক হাজারের ওপর
রাসায়নিক উপাদানের জন্য -যেমন, এ্যামিনো এ্যাসিড (থিয়ানিন Theanine),
বিভিন্ন এনজাইম, পলিফেনল জাতীয় যৌগ(compound), বিভিন্ন কার্বোহাইড্রেড,
ক্যাফিন এবং নানারকম রঞ্জক-পদার্থ (pigments) ।এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
হল পলিফেনলের দল - যা চায়ের কুঁড়ি আর প্রথম দুটো পাতায় থাকে সবচেয়ে বেশী।
প্রায় তিরিশ হাজার পলিফেনলের যৌগ থাকে সেখানে – যার মধ্যে প্রথমেই আসে
ফ্ল্যাভনয়েড গ্রুপ - যাকে চলতি কথায় বলা হয় ফ্লেভানল বা
ট্যানিন।ফ্ল্যাভনয়েড-এরও আবার নানা উপবিভাগ আছে -ক্যাটাচিন, এপিক্যাটাচিন
ইত্যাদি।
সেই সব পাতাকে
যখন গাছ থেকে ছেঁড়া হয় তখন থেকেই এই রাসায়নিক উপাদানগুলোর মধ্যে নানা রকম
পরিবর্তন শুরু হয়ে যায়।চা পাতা লালচে হতে শুরু করে।(যে কারণে উ লং-এর পাতা
লালচে হয়ে গিয়েছিল)। তারপর তাকে যত প্রসেস করা হয় – সেই সব উপাদানগুলো নানা
ভাবে ভেঙে, একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে আরও অনেক রকম নতুন ও জটিল যৌগে
পরিবর্তিত হয়- যেমন থিয়াফ্লাভিন (Theaflavins), থিয়ারুবিজিন
(Thearubigin)।এসব যৌগই চা-কে চায়ের প্রিয় গুণগুলো দেয় - চায়ের সুবাস
(aroma/flavor), কষাটে ভাব (astringency), রঙ, মাথায় ঘুম-তাড়ানোর সংকেত
ইত্যাদি।
চায়ের এইসব
উপাদানগুলো থাকে তার পাতার কোষের (Cell) ভিতর।কোষে একরকম জলীয় পদার্থ থাকে
যাকে বলা যায় প্রাণরস (Sap)। তার ভিতরেই ভেসে থাকে সেই উপাদানগুলো।
পাতাকে
যখন দলাইমলাই করা হয় তখন পাতার কোষগুলো ফেটে যায় আর উপাদানগুলো বেরিয়ে আসে
বাইরে। বাইরে এসেই তারা বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে নানারকম বিক্রিয়া শুরু
করে। শুরু হয়ে যায় ভাঙাভাঙি আর নতুন নতুন যৌগ তৈরির কাজ। অক্সিজেনের সঙ্গে
এই বিক্রিয়াকে বলে জারণ (oxidation)।
মানুষ
জারণ প্রক্রিয়ার কথা জেনেছে পরে। তার বহু আগে থেকেই তারা দেখেছে ভেজা
ফল,ফুল, ফলের রস, দানা শষ্য ইত্যাদি যদি কিছুদিন পাত্রে ধরে রাখা হয় –
তাহলে তা মদ-এ পরিণত হয়।এই পরিবর্তন ঘটে ‘ইস্ট’ (yeast) নামে একরকমের
ব্যাকটেরিয়া বা অনুপ্রাণ(microorganism)-এর কারণে।তারা দানাশষ্য ইত্যাদিকে
খেয়ে, ভেঙে মদ তৈরি করে দেয়। এই ঘটনাকে চলতি কথায় বলে ‘গেঁজানো’
(Fermentation)। ‘গেঁজানো’তে কোন না কোন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকতেই
হবে।
এখন মজা হল, সে সময়ে
চায়ের পাতার এইরকমের পরিবর্তনকেও মানুষে ভাবত বুঝি ‘গেঁজানো’। তাই
চা-পাতাকে দলাইমালাই করে ফেলে রেখে যে পরিবর্তন ঘটানো – তাকে
ফার্মেন্টেশানই (fermentation) বলা হতে লাগল। এবং আজকেও, যখন মানুষ জেনে
গ্যাছে যে সেটা ফার্মেন্টেশান নয়-অক্সিডেশান ( সেখানে ব্যাকটেরিয়ার
উপস্থিতি বরং ভীষণই অনভিপ্রেত) – তখনও চায়ের ভাষায় (tea parlance) চা-তৈরির
এই পর্যায়কে ফার্মেন্টেশান-ই বলা হয়। আমরাও তা-ই বলব এরপর থেকে।
ছবি সৌজন্যঃ ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট থেকে নেওয়া