বিবর্তনের পথে শহর দার্জিলিং-২৩/রূপন সরকার
বিবর্তনের পথে শহর দার্জিলিং/পর্ব-২৩
ড. রূপন সরকার
শহর দার্জিলিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর সংস্কৃতিক বহুত্ববাদ। জন্মলগ্ন থেকেই নিকট-দূর, দেশ-বিদেশের বহু মানুষ এই শৈল শহরের মায়ার বাঁধনে আকৃষ্ট হয়ে এতদঞ্চলে সংস্কৃতিকে বহুত্ববাদী চরিত্র দান করেছে। দার্জিলিংয়ের সংস্কৃতিক ইতিহাস ঘাটলে কোথাও খুজে পাওয়া যাবে না, যেখানে একটি বিশেষ সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য অন্য কোন সম্প্রদায় বা বিশ্বাসের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বরং প্রত্যেকে নিজস্ব সংস্কৃতিক চর্চাকে বজায় রেখে সহাবস্থানের ভিত্তিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। একে অপরের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেছে। এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতি নানাভাবে পুষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ এই পার্বত্য শহরে এসেছেন। ১৮৭৩ সালের একটি তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, দার্জিলিং শহরে ৩৩,৩২৪ জন বাংলায় কথা বলতেন, ১৬,০৪৪ জন হিন্দুস্থানী ভাষায়, ৩,৯৫২ জন লেপচা ভাষায়, ৬,০০০ জন তিব্বতীয় ভাষায়, ২৫,৭৮১ জন নেপালী ভাষায়, ৬,৭৫৭জন মূর্মি ভাষায়, ১৭৬৬ মেচ এবং ১২৮৮ ইউরোপীয় এবং অন্যান্য ভাষায়।
দার্জিলিং শহরের এই ভাষাগত বিন্যাস প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠেছে অভিবাসনের মাধ্যমে। চা-বাগান সহ সমস্ত ধরনের কাজের জন্য সস্তা শ্রমিক লাভের আশায় ইংরেজরা সরাসরি এই অভিবাসনকে উৎসাহিত করতো এবং ব্রিটিশ আইনে এরা নিরাপত্তা পেত। এই অভিবাসন যেমন পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ছিল, তেমনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং নেপাল, ভুটান, তিব্বতের মতো প্রতিবেশি দেশ থেকেও ঘটেছিল। শুধু শ্রমিকের চাহিদা মেটানো নয়, দ্রুতগতিতে বৃৃদ্ধি পাওয়া বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজনকে টেনে এনেছিল শহর দার্জিলিংয়ে। এদের মধ্যে ছিলেন নেপালি, ভুটানী, তিব্বতি, বাঙালি, মাড়ওয়ারি, পাঞ্জাবি, বিহারী, কাশ্মীরি, হিন্দুস্থানী ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষজন। এই সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষজন দার্জিলিং এসে বিভিন্ন ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়। এই সমস্ত বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের উপস্থিতি বলে দেয় শহর দার্জিলিং কতটা বহুত্ববাদে সমৃদ্ধ। দেশীয় বা বলা ভালো এশিয় ভাষা সংস্কৃতির পাশাপাশি ইউরোপীয় ভাষা সংস্কৃতির সহাবস্থান দার্জিলিংয়ের বহুত্ববাদকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছে।
কেবলমাত্র ভাষাগত ভিন্নতা নয়, বৈচিত্রময় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অস্থিত্বও দার্জিলিং শহরের বহুত্ববাদী চরিত্রের চিত্র তুলে ধরে। এই সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে মঠ এবং গুম্ফাগুলির প্রাচীনত্ব বিশেষভাবে নজরকাড়ে। এই মঠগুলি ছিল দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলের বৌদ্ধ সংস্কৃতির পিঠস্থান। শহর তথা পার্বত্য অঞ্চলের এক বিরাট অংশের আদিবাসীদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মঠগুলির মধ্য অন্যতম প্রাচীন মঠটি হলো দার্জিলিং মঠ, যা ১৭৬৫ সালে সিকিমের ফুডং (Phodong) মঠের শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৫ সালে নেপালের সৈন্য বাহিনী এই মঠটি লুঠ করে করে বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে এই মঠটিকে ভুটিয়া বস্তিতে স্থানান্তরিত করে দেওয়া হয়। এছাড়া ঘুম ও Ging মঠ নামে আরো দুটি মঠ আছে। সিকিমের সাথে বিরোধের ফলশ্রুতিতে Ging মঠটি ব্রিটিশরা ধ্বংস করে দিলেও ১৮৯৬ সালে এই মঠটিকে নতুন ভাবে তৈরি করা হয়। শেরাব লামা নামে এক ব্যক্তি ১৮৭৫ সালে ঘুম মঠটি স্থাপন করেছিল। প্রায় ৫০ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু এই মঠটিতে থাকতেন। একজন সম্পাদক সহ একটি কমিটি এই মঠটির দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন।
বৌদ্ধ মঠগুলির পাশাপাশি ইউরোপীয় নাগরিকদের ধর্মচর্চার কেন্দ্র হিসেবে একাধিক খ্রিশ্চান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এই শৈল শহরে। সর্বপ্রথম যে চার্চটি শহর দার্জিলিংয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় তার নাম St. Andrew's Church। এই চার্চের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয় ১৮৪৩ সালের নভেম্বর মাসে। শহরের সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন বিশপ প্রাথমিকভাবে চার্চটি তৈরি করার কাজ দেখাশোনা করেন। ১৫০ জনের বসার জায়গা সহ চার্চটি তৈরি করতে ৯,০০০ টাকা খরচ হয়েছিল তৎকালিক সময়ে। ১৮৬৭ সালে আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর ১৮৭০ সালে চার্চটি পুনরায় নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে এই চার্চে ৪৫০ জনের একত্রে প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়। অকল্যান্ড রোডে ১৮৬৯ সালে St. Columbus Church টি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কটল্যান্ড মিশনারিসদের পক্ষ থেকে চার্চটি তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়াও ক্যাথলিক চার্চগুলি শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমনটা হয়ে থাকে মসজিদের ক্ষেত্রে। উদাহারণ হিসেবে লরেটো কনভেন্ট এবং সেন্ট জোসেফ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন চার্চের কথা বলা যেতে পারে।
দার্জিলিং শহরে প্রথম মসজিদটি ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়েছিল বলে দাবী করা হয়ে থাকে। লালদিঘীর পাশে অবস্থিত এই মসজিদটির প্রাচীনত্বে দাবীর সমর্থনে যদিও কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমান পাওয়া যায় নি। মসজিদের বর্তমান কাঠামোটি তৈরি হয়েছিল ১৮৫১ থেকে ১৮৬২ সালের মধ্যে। নাসির আলি খান, সেলামত আলি সহ বেশকিছু সরকারি অফিসার মসজিটি তৈরি হয়। এটি ছাড়াও কার্ট রোডের নিচে ছোটা মসজিদটি আরো কিছু সময় পর তৈরি হয়েছিল। এটাই আরো কিছু সময় পরে জামা মসজিদে পরিণত হয়। শহর দার্জিলিংয়ে সব থেকে প্রাচীন মন্দিরটি দেখা যায় শহরের বাজার এলাকায়। মনে করা হয় এই মন্দিরটি ১৮৪০ সালের পূর্বে মন্দিরটির অস্থিত্ব ছিল। রঞ্জিত সিং নামে এক স্থানীয় পুলিশ কর্মী মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন এবং শহরের প্রথম মাড়োয়াড়ি ব্যবসায়ি সম্ভুরাম ও চুনিলাল মন্দিরটি বাজার এলাকায় নিয়ে আসেন। ১০০ জনের প্রার্থনার ব্যবস্থা সহ ব্রহ্ম মন্দিরটি নির্মিতি হয়েছিল ১৮৮০ সালে। ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী নামে এক স্কুল শিক্ষকের সহায়তায় মন্দিরটি নির্মিত হয়।
এভাবেই নানা ভাষাভাষী, সম্প্রদায় তথ ধর্ম, বর্ণের মানুষের সমন্বয়ে দার্জিলিং এক মিশ্র সংস্কৃতির পিঠস্থান হয়ে ওঠে।
শেষ পর্ব
আপনাদের
মূল্যবান মতামত জানাতে কমেন্ট করুন ↴