সহজ উঠোন

রেজিস্টার / লগইন করুন।

সব কিছু পড়তে, দেখতে অথবা শুনতে লগইন করুন।

Sahaj Uthon
05-December,2022 - Monday ✍️ By- নীলাঞ্জন মিস্ত্রী 362

সানিয়া-১/নীলাঞ্জন মিস্ত্রী

সানিয়া
পর্ব-এক
নীলাঞ্জন মিস্ত্রী
"""""""""""""""""""""
ছেঁড়া ফুলপ্যান্ট আর বুকফাড়া সোয়েটার পরা ছোট্ট ছেলেটা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় উনোনের দিকে। চায়ের জন্য বাটিটা এগিয়ে দিতেই-
- তুই দড়ি বান্দিবার পারিস না, দুধ দোয়াবার পারিস না। তোর আবার চা কিসের রে? তুই শালা ভঁইসের মুত খা।
তাচ্ছিল্য ভরা এই কথাগুলি বারো বছরের কলিজাটাকে ফালা ফালা করে দেয়। তীব্র যন্ত্রনায় ড্যাব ড্যাব করে ছোট্ট ছেলে চেয়ে থাকে মুচকি হাসা মুখগুলির দিকে। মাথাটা নুইয়ে গেল তার একরাশ অভিমান ও লজ্জার ভারে। বাটিটা হাতে নিয়েই নালিশ জানাতে ফিরে আসে নদীর দিকে। কিন্তু নদী কোথায়? পেছনের ঘরটাও যে আর দেখা যায় না। ঘন কুয়াশায় মাঝে দিক হারায় ছোট্ট সানিয়া। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে বালির উপর।
প্রতিদিনের লাল সূর্যটা আজ মায়ের মতোই লুকিয়ে রয়েছে কুয়াশার ওপারে। কুয়াশা সরিয়ে করুণ দু'টি চোখ আজ কেন জানি মায়ের দেখা পেতে চাইছে। ছোট্ট সানিয়ার মনপাখিটা ছুটে যায় ধূপগুড়ির উত্তরে পূর্ব নাথুয়ায়। বাঁশবাগানের পাশে তাদের ছোট্ট কুঁড়েঘরে। সেই মায়ের বুকের ওম জড়ানো ছেঁড়া কাঁথার সকাল। সবাইকে শুইয়ে রেখে মা উঠে গেছেন বিছানা ছেড়ে। ঘর ভরেছে ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে। ধোঁয়া সরাতে উনোনের মুখে আজলা আজলা ফুঁ পাঠাচ্ছে মা। অবশেষে আগুন জ্বলে উনোনে। শীতকে সরিয়ে ভালোবাসা ছড়ায় উষ্ণতা। মা ব্যস্ত হয়ে পরেন সকালের পানীয় তৈরীতে। লবন চা তৈরী হতে হতেই মায়ের হাক। মায়ের এক ডাকে একে একে উঠে পরে সব ভাইবোন। ঘরের সামনেই ছোট্ট পাতকুয়া। ভাই বাচ্চু ও বোন ফুলমনীর জন্য পাতকুয়া থেকে জল তুলে রেখেছে সে। হাত-মুখ ধুইয়ে মাটির উনোন ঘিরে সবাই একসাথে বসে। মুড়ি চেবাতে চেবাতে কত গল্পই না হত মা বাবা ভাই বোনের সাথে। কতদিন হয়ে গেল মায়ের হাতের সেই এক গ্লাস লবন চা মুখে ওঠে না তার।
কুয়াশা কাটে না সহজে। ঠান্ডা লাগছে বেশ। কিন্তু কিছু করার নাই। কারও আওয়াজও তো কানে আসে না। হঠাৎ করেই ছোট বেলা মায়ের মুখের সেই গল্পটা মনে পরে তার। পায়ের ছাপ দেখে দেখে সানিয়া আগের পথ খুঁজে পায়। এগিয়ে যায় ঘরের দিকে। তাকে দেখতেই-
-কোঠে গেসিলিরে বাউ। শিয়াল কুকুর ধরিলে বুঝিবার পারিলো হয়।
-এঠে আয়। তোর চা নিয়া যা।
মাটির হাঁড়ি থেকে এক অলকা জল তুলে মুখ ধুয়ে নেয় সানিয়া। তারপর বাটিহাতে আবার পৌঁছায় রান্নাঘরে। মৈষালদের তাকে দেখে মায়া হয় বটে। কিন্তু মজা না করে ছাড়েনা। সেই মজার কথাগুলিই যে ছোট্ট সানিয়ার বুকে কি ক্ষত তৈরী করে সেটা বোঝবার ইচ্ছেও নেই তাদের। এখানে সকাল বিকাল এক বাটি করে গরম গরম চা মেলে প্রতিদিন। তবে এই চা লবন-গুড় আর ভইসা দুধের চা। এ চায়ে দুধ-গুড় আছে ঠিকই কিন্তু মায়ের হাতের সেই লবন চা-ই যে বেশি ভালো ছিলো।
বাকালির চরে সুবল ঘোষের মহিষ বাথান। প্রায় সাড়ে তিনশ' মহিষ রয়েছে সেখানে। মহিষের দেখভাল করবার জন্য রয়েছে আটজন অভিজ্ঞ মৈষাল। বয়সে তারা অনেক বড়। ছোট্ট সানিয়া পেটে-ভাতে খাটতে এসেছে এই বাথানে। চল্লিশ-পঞ্চাশটি পরুর(মহিষের বাচ্চা) দেখভাল করে সে।
মা রুপনী মুর্মু জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন বছর দু'য়েক আগে। বাবা হপনা মুর্মু তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বড্ড অসহায় হয়ে পরেন। ছেলে-মেয়েদের মুখে দু'মুঠো ভাত রেঁধে তুলে দেবেন; নাকি অন্যের জমিতে আধিয়ারি করে অন্নের সংস্থান করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না। পিঠাপিঠি বয়স তার ছেলে মেয়েদের। সানিয়াই সবথেকে বড়। দশ বছর বয়স থেকেই ভাই-বোনের দায়িত্ব সামলে চলে সানিয়া। ওদিকে একহাল গরু ও ছয় মণ ধানের বিনিময়ে অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে চলেন তার বাবা। এভাবেই আধপেটা খেয়ে চলতে থাকে সংসার।
বছর দুই যেতে না যেতেই খাদ্য সঙ্কটের কবলে পরে হপনা মুর্মুর পরিবার। জমির ফলন যায় কমে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে জমির ফসল হয় নষ্ট। তারপর ছয় মণ ধান জমির মালিককে শোধ দিয়ে নিজেদের জন্য থাকে যৎসামান্য। চারটি পেট ভরেনা তাতে। কি করবে ছোট্ট সানিয়া? কয়েক মাসের অভিজ্ঞতায় সে আজ সাবালক। বাধ্য হয়েই নিজের পেট চালাবার জন্য বেরিয়ে পরে কাজের খোঁজে। গধেয়ার কুঠি এলাকায় মহিষের ধুরার কাজ নেয় সে। এই ধুরারও মালিক সুবল ঘোষ। থাকেন জলপাইগুড়িতে। ধুরার বাচ্চা মহিষ চরিয়ে বেরায় জলঢাকা নদীর চরে চরে। আবার কখনও পরুদের নিয়ে বিচরণ করে গরুমারার জঙ্গল ঘেঁষে। এই কাজ করতে করতে ভাঙ্গাবেড়া নামের মৈষালের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে সানিয়ার। তার দু:খে ভাঙ্গাবেড়ারও প্রাণ কাঁদে। বাকালির চরে সুবল ঘোষের মহিষ বাথানের খবর ভাঙ্গাবেড়ার কাছ থেকেই পায় সানিয়া। জলঢাকার চর ছাড়বে ভাঙ্গাবেড়া। যাবে তিস্তার চরের মহিষ বাথানে। সেখানে খাটুনী কম। অভাব নেই কিছুর। অবশেষে ভাঙা বেড়ার হাত ধরে, ভাই বোন বাবাকে ছেড়ে সানিয়ার ঠিকানা হয় সুবল ঘোষের মহিষ বাথান।

আপনাদের মূল্যবান মতামত জানাতে কমেন্ট করুন ↴
software development company in siliguri,best
                            software development company in siliguri,no 1 software
                            development company in siliguri,website designing company
                            in Siliguri, website designing in Siliguri, website design
                            in Siliguri website design company in Siliguri, web
                            development company in Siliguri